যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বা যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কেন্দ্র করে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বর্তমানে দেশটির রাজনৈতিক মেরুকরণ স্পষ্ট: একদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী রক্ষণশীল অংশ, অন্যদিকে রয়েছে জেবহে-ই পায়দারি বা ইনডুরেন্স ফ্রন্ট ও সাঈদ জলিলির সমর্থক উগ্র-বিপ্লবী গোষ্ঠী। এই দুই পক্ষের মধ্যকার গভীর ফাটল ও ক্ষমতার লড়াই এখন রাজপথে প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে।
তেহরানে ইসরাইলি ও মার্কিন যৌথ বিমান হামলায় নিহত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেইর সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় জানাজায় এই দ্বন্দ্বের কুৎসিত রূপ দেখা গেছে। শোক প্রকাশের পরিবর্তে কালো পোশাক পরিহিত কট্টরপন্থীরা বর্তমান নেতৃত্বের ওপর ক্ষোভ প্রকাশে বেশি ব্যস্ত ছিল। জানাজায় উগ্রপন্থীরা প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের উদ্দেশ্যে আপসকারীর মৃত্যু হোক বলে স্লোগান দেয়। এছাড়া ওয়াশিংটনের সাথে যুদ্ধবিরতির রূপকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে বিশ্বাসঘাতক আখ্যা দিয়ে পাথর ছুড়ে মারা হলে তিনি ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হন। শাহার-ই রে এলাকায় ধর্মীয় সংগীতশিল্পী মোহাম্মদ আলী বখশি সরাসরি প্রেসিডেন্টকে হত্যার হুমকি দিয়ে বলেন, সর্বোচ্চ নেতার শর্ত পূরণ না হলে ব্লেড ও গলা মুখোমুখি হবে। এমন গুরুতর হুমকিতেও এখন পর্যন্ত কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
উগ্র-কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর দাবি, বর্তমান নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে এবং প্রয়াত নেতার ছেলে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনেইর রেড লাইন লঙ্ঘন করেছে। সংসদ সদস্য মাহমুদ নাবাবিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ একে একটি আসন্ন অভ্যুত্থান হিসেবে অভিহিত করেছেন। কট্টরপন্থীদের মতে, মোজতবা খামেনেই বর্তমানে আত্মগোপনে থাকায় এই সুযোগে গালিবাফ ও পেজেশকিয়ান ক্ষমতা কুক্ষিগত করছেন।
এই নৈরাজ্য দমনে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। সমঝোতার বিরোধী ও নথি ফাঁসকারী আইনপ্রণেতা মাহমুদ নাবাবিয়ানকে জাতীয় নিরাপত্তা কমিশন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হামিদ রাসায়িকে সাময়িকভাবে আটক এবং ৬০ জন সংসদ সদস্যের অবস্থান ধর্মঘট নিরাপত্তা বাহিনীর চাপে ব্যর্থ করা হয়েছে। গালিবাফপন্থী আইনপ্রণেতারা এই উগ্রপন্থাকে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা ও সরকার পতনের চক্রান্ত বলে বর্ণনা করেছেন।
ইরানের ৯ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে কট্টরপন্থীদের সংখ্যা সীমিত হলেও পার্লামেন্ট, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমে তাদের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। তবে যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে থাকা সাধারণ মানুষের পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে, কট্টরপন্থীদের উসকানি ও রাজপথের উত্তেজনা দেশটিকে যে কোনো সময় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানুচেহর মোত্তাকিও কড়া সুর মিলিয়ে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার উসকানি দিয়েছেন।