ফিফা বিশ্বকাপের বর্তমান ট্রফিটি মূলত একজন ইতালীয় ভাস্করের সৃষ্টি। এই ট্রফির সর্পিল নকশার মাধ্যমে অ্যাথলেটের সংগ্রাম, ভক্তদের উল্লাস এবং বিজয়ের মুহূর্ত—এই তিনটি ক্রীড়া আবেগ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন নকশাকার সিলভিও গাজ্জানিগা। আগামী রবিবার ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর আর্জেন্টিনা অথবা স্পেনের যেকোনো একটি দল এই ট্রফিটি জয়ের গৌরব অর্জন করবে। ফুটবলের এই মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি সম্পর্কে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছে।
১৯৭০ সালে ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে মূল ‘জুলেরিমে’ ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের করে নেওয়ার পর ফিফা নতুন ট্রফির জন্য উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। মিলানের ব্রেরা এলাকার স্টুডিওতে বসে সিলভিও গাজ্জানিগা এই নতুন নকশাটি তৈরি করেন। তার ছেলে জর্জিও গাজ্জানিগার মতে, তার বাবা প্রচুর স্কেচ করার পর এমন একটি ধারণা চূড়ান্ত করেন, যেখানে দুটি মানব অবয়ব সর্পিল আকারে ওপরের দিকে উঠে পৃথিবীকে প্রতিনিধিত্বকারী একটি গোলককে ধরে রেখেছে। ২০১৬ সালে মারা যাওয়া গাজ্জানিগা ইতালির জিডিই বার্টোনি এসআরএল-এর হয়ে কাজ করতেন এবং উয়েফা কাপসহ বেশ কিছু মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি তিনি তৈরি করেছিলেন।
প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফিটি ১৯৩০ সালে প্রবর্তিত হয়েছিল এবং টুর্নামেন্টের প্রতিষ্ঠাতার নামানুসারে একে জুলেরিমে ট্রফি বলা হতো। গ্রীক দেবী নাইকির অবয়ব খচিত এই ট্রফিটি দুইবার চুরি হয়েছিল। প্রথমবার ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে প্রদর্শনের সময় এটি চুরি হলেও পরবর্তীতে পিলকস নামের একটি কুকুর দক্ষিণ লন্ডনের একটি ঝোপের নিচে তা খুঁজে পায়। তবে ১৯৮৩ সালে ব্রাজিলীয় ফুটবল কনফেডারেশনের সদর দফতর থেকে এটি আবারও চুরি হয় এবং এরপর আর কখনোই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি; ধারণা করা হয় চোরেরা এটিকে গলিয়ে ফেলেছিল।
নতুন ট্রফির জন্য ৫০টিরও বেশি নমুনা জমা পড়লেও গাজ্জানিগার মডেলটিই বিচারকদের মন জয় করে। তার ছেলের ভাষ্যমতে, অ্যাথলেটের শারীরিক কসরত ও পরিশ্রম ফুটিয়ে তুলতে ট্রফির শরীরকে অমসৃণ ও রুক্ষ করা হয়েছে, যা বিজয়ের জন্য লড়াইয়ের প্রতীক। ট্রফির ওপরের পৃথিবী এবং হাতের অবয়বগুলো বিজয়ের ডানার মতো কাজ করে, যা অ্যাথলেট ও ভক্তদের সম্মিলিত আনন্দকে ধারণ করে। গাজ্জানিগার পরিবার মিলানের উপকণ্ঠে তার অফিসটি এখনো অবিকল সংরক্ষণ করে রেখেছে, যেখানে মূল প্রোটোটাইপ ও মোমের ছাঁচ সংরক্ষিত আছে।
ফাইনাল শেষে বিজয়ী দলের অধিনায়ক যে ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরেন, সেটি ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি এবং এর উচ্চতা ৩৬ সেন্টিমিটার (১৪ ইঞ্চি)। এর নিচে সবুজ ম্যালাকাইটের দুটি বলয় খেলার মাঠকে নির্দেশ করে। টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর মূল ট্রফিটি আবার ফিফার কাছে ফেরত চলে যায় এবং সুইজারল্যান্ডে তাদের সদর দফতরে সংরক্ষিত থাকে। বিজয়ী দল তাদের দেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য কেবল একটি স্বর্ণালী প্রলেপযুক্ত রেপ্লিকা পায়। ফিফা এখন আর কোনো দলকে তিনবার চ্যাম্পিয়ন হলেও মূল ট্রফিটি স্থায়ীভাবে রাখার অনুমতি দেয় না। গাজ্জানিগার নকশা করা এই ট্রফিটি এবার নিয়ে ১৪টি বিশ্বকাপে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং ফিফার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অন্তত ২০৩৮ সাল পর্যন্ত এটিই ব্যবহৃত হবে। জর্জিও গাজ্জানিগা আজও ১৯৭৪ সালের সেই মুহূর্তটির কথা মনে করেন, যখন মিউনিখে জার্মান দল প্রথমবারের মতো তার বাবার তৈরি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরেছিল এবং একটি সাধারণ বস্তু ফুটবলের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।