সরকারি খাতের অন্যতম বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান জনতা ব্যাংক পিএলসিতে সংঘটিত ভয়াবহ ঋণ জালিয়াতি ও মানিলন্ডারিংয়ের ঘটনায় নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকের লোন কমিটির যোগসাজশে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বড় অঙ্কের ঋণ দিয়ে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় তৎকালীন প্রধান কার্যালয়ের ঋণ কমিটির ১০ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের উপ-পরিচালক ও তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. জয়নাল আবেদীন।
তদন্ত সূত্র ও নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, জনতা ব্যাংক পিএলসি’র লোকাল অফিসের গ্রাহক ‘এয়ারওয়েজ লিমিটেড’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এই জালিয়াতির নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসা পরিচালনার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং পরস্পর যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলা হয়। ইডিএফ (এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড) সুবিধাসহ বিভিন্ন ধরনের ঋণ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে চক্রটি নিজেদের মধ্যে পণ্য আমদানি-রপ্তানি দেখায়। বাস্তবে কোনো ব্যবসা বা পণ্য পরিবহন না থাকলেও ‘অ্যাকোমোডেশন বিল’ তৈরির মাধ্যমে তারা সর্বমোট ৪ কোটি ৮৯ লাখ ৭৮ হাজার ৬৭৮ মার্কিন ডলার আত্মসাৎ করে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪১৬ কোটি ৩৯ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯২ টাকা। এর মধ্যে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৩৬ হাজার ৩৮৩ মার্কিন ডলারের কোনো বৈধ দলিলাদি বা অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি, যা সরাসরি মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের লঙ্ঘন।
এই আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় সরাসরি স্বাক্ষরকারী ও অনুমোদনকারী কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতার বিষয়টি এখন সামনে এসেছে। আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হয়ে বক্তব্য প্রদানের জন্য যাদের তলব করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন উপ-মহাব্যবস্থাপক ও সদস্য সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ, মহাব্যবস্থাপক ও সদস্য মো. আশরাফুল আলম, মোসাম্মৎ আন্নিয়া বেগম, মো. আব্দুল মতিন, মিজানুর রহমান এবং এস এম আব্দুল ওয়াদুদ। এছাড়াও তলব করা হয়েছে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সদস্য মো. ফয়েজ আলম, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম মতুর্জা, মো. কামরুল আহসান এবং ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনকে।
ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, লোন কমিটির সদস্যদের অনুমোদন ছাড়া এতো বিপুল অংকের ঋণ ছাড় হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। লোন কমিটির সভায় কোন যুক্তিতে বা কার প্ররোচনায় অভিজ্ঞতাহীন একটি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া হলো, সেই রহস্য উন্মোচন করাই এখন দুদকের মূল লক্ষ্য। ব্যাংকিং নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হয়েছে কি না বা তারা নিজেরা কোনোভাবে লাভবান হয়েছেন কি না, তা নিয়েও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবানবন্দির পর তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অভিযুক্তদের অপরাধ প্রমাণিত হলে মানিলন্ডারিং আইনের আওতায় তারা শাস্তির সম্মুখীন হতে পারেন।