টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিস্তীর্ণ সবজি ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর ফলে রাজধানী ঢাকার কাঁচাবাজারগুলোতে সবজির সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় প্রতিটি সবজির দাম কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর অধিকাংশ সবজি ১০০ টাকা বা তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এই অস্থির বাজারে সাধারণ মানের কাঁচা মরিচের দামও রেকর্ড গড়ে প্রতি কেজি ২৪০ টাকায় পৌঁছেছে।
শুক্রবার সকালে কারওয়ান বাজার, মালিবাগ, রামপুরা ও মোহাম্মদপুর টাউন হলসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও ভোগান্তি বিরাজ করছে। বাজারদরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি বেগুন ১২০ টাকা, করলা ১০০ থেকে ১২০ টাকা, শসা ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ১০০ টাকা, ঝিঙা ১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং পটল ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া লাউ প্রতি পিস ৮০ থেকে ৯০ টাকা, লাল টমেটো ১৪০ টাকা, উন্নত মানের গাজর ১৬০ টাকা এবং কাঁকরোল ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে। তুলনামূলকভাবে কেবল পেঁপের দাম কিছুটা সহনীয়, যা ৪০ টাকা কেজিতে পাওয়া যাচ্ছে। মিষ্টি কুমড়া প্রতি পিস ৫০ টাকা, চাল কুমড়া ৮০ টাকা এবং কাঁচা কলা প্রতি হালি ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ এই মূল্যবৃদ্ধিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। মোহাম্মদপুর টাউন হলে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী রফিকুল ইসলাম জানান, কয়েক দিন আগেও যেসব সবজি ৫০-৬০ টাকায় কেনা যেত, আজ তা দ্বিগুণ দামে কিনতে হচ্ছে। বেতনের টাকায় সপ্তাহের বাজার করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সালমা বেগম নামে আরেক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সামান্য সবজি ও মরিচ কিনতেই প্রায় এক হাজার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। বাজারে কার্যকর তদারকির অভাব থাকলে সাধারণ মানুষ আরও বিপদে পড়বে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, যশোর, নরসিংদী, বগুড়া ও কুমিল্লার মতো সবজি উৎপাদনকারী অঞ্চলের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষক ফসল তুলতে পারছেন না। মোহাম্মদপুর টাউন হলের বিক্রেতা মো. এরশাদ জানান, আড়ত থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে এবং অনেক সবজি পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কারওয়ান বাজারের পাইকারি আড়তদার হাজি মো. রাজিব হোসেন যোগ করেন, ঢাকায় আসার পথে পরিবহনে জট ও ট্রাক ভাড়া বাড়ায় দাম কমার সম্ভাবনা কম যতক্ষণ সরবরাহ স্বাভাবিক না হয়।
তবে ভোক্তা অধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এর সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা করছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান পাইকারি ও খুচরা বাজারের মধ্যে দামের অস্বাভাবিক ব্যবধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারকে কঠোর নজরদারির আহ্বান জানিয়েছেন। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ. এইচ. এম. সফিকুজ্জামান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাদের টিম নিয়মিত বাজার তদারকি করছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মাসুদ করিম জানান, ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের বিকল্প হিসেবে অন্য অঞ্চল থেকে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় পরিবহন চাঁদাবাজি রোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দাম কমার সম্ভাবনা কম। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির মাধ্যমে সুলভ মূল্যে সবজি বিক্রির উদ্যোগ নিলে সাধারণ মানুষের কষ্ট কিছুটা লাঘব হতে পারে।