ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’ (NEET)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন ও অনশনের অবসান ঘটেছে। টানা ২৬ দিন অনশন করার পর অবশেষে তা ভেঙেছেন লাদাখের বিশিষ্ট সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা এবং সম্ভাব্য সহিংসতা এড়ানোর আশ্বাসে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গুরুগ্রামের মেদান্তা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৫৯ বছর বয়সী ওয়াংচুককে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে অনশন ভাঙতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, মন্ত্রীরা তাকে একটি পেয়ালা থেকে তরল পান করতে সহযোগিতা করছেন। এ সময় সেখানে ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমোও উপস্থিত ছিলেন। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—সরকারের পক্ষ থেকে এমন আশ্বাস পাওয়ার পরই মূলত তিনি অনশন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন। অনশন প্রত্যাহারের পর উপস্থিত কয়েকজন তাকে উত্তরীয় পরিয়ে সম্মান জানান।
অনশন ভাঙকার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে সোনম ওয়াংচুক জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৬৫ জন সংসদ সদস্য তাকে অনশন ভাঙার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন বা দেখা করেছিলেন। নানা শর্ত নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর এবং সম্ভাব্য সহিংসতার কথা মাথায় রেখে তিনি অনশন ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শিগগিরই একটি ভিডিও বার্তায় তিনি এসব শর্ত বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবেন এবং আন্দোলন সংশ্লিষ্টদের যেকোনো ধরনের সহিংসতা রুখে দেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক্সে এক পোস্টে ওয়াংচুকের সুস্বাস্থ্য কামনা করে তাকে চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলার এবং দ্রুত আগের ওজন ফিরে পাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। এছাড়া এক ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে এবং এ বিষয়ে আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই দিন দিল্লি হাই কোর্ট প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের ঘোষণা দেয়।
ভারতের মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট)-র প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গত ২০ জুন থেকে দিল্লির যন্তরমন্তরে আন্দোলন করছে যুব সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। তাদের এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ওয়াংচুক ঘোষণা করেছিলেন, ২৭ জুনের মধ্যে সরকার কোনো পদক্ষেপ না নিলে তিনি অনশনে বসবেন। কেন্দ্রের কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে গত ২৮ জুন থেকে অনশন শুরু করেন লাদাখের এই সমাজকর্মী। অনশনের ২১তম দিনে তার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে আদালতের নির্দেশে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগে দিল্লি হাই কোর্ট এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছিল। অনশনের তৃতীয় দিনে এক সাক্ষাৎকারে ওয়াংচুক বলেছিলেন, এই অনশন ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে।
উল্লেখ্য, গত বছর লাদাখে এক আন্দোলনের সময় উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে ওয়াংচুককে অভিযুক্ত করেছিল মোদী সরকার। প্রায় ছয় মাস কারাভোগের পর চলতি বছরের মার্চ মাসে তিনি মুক্তি পান। তবে ওয়াংচুক সরকারের তোলা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, ওই সহিংসতা ছিল মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি স্থানীয় মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
ওয়াংচুকের অনশন ভাঙার সিদ্ধান্তে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ। তিনি ওয়াংচুকের অটুট মনোবলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, নিজের জীবন বাজি রেখে তিনি দেশের বিবেককে জাগিয়ে তুলেছেন। তবে সিজেপির আন্দোলন ৩৪তম দিনে গড়ালেও সরকারের সঙ্গে তাদের আলোচনা স্থবির হয়ে আছে। গত সোমবার সিজেপির ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় দিল্লি। পুলিশ লাঠিচার্জ, কাঁদুনে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। মুম্বাইয়েও বিক্ষোভকারীদের আটক করা হয়। বুধবার রাতেও যন্তরমন্তরে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বৃহস্পতিবার যন্তরমন্তরের আশপাশের দেড় কিলোমিটার এলাকায় মধ্যরাত পর্যন্ত মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়।
শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের এই লাঠিচার্জের প্রতিবাদে কংগ্রেসও বিক্ষোভে নামে। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধর্নায় বসা কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে পুলিশ আটক করে টেনেহিঁচড়ে বাসে তুলে নিয়ে যায়। অবশ্য কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখার পর রাত ৯টার দিকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। সরকার দাবি করেছে, তারা চারবার সিজেপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া পায়নি।