পাকিস্তানের বৃহত্তম শহর করাচির একটি সরকারি হাসপাতালে এইচআইভি সংক্রমণের ঘটনায় অন্তত ১৩০ জনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের বেশির ভাগই শিশু। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে। বার্তাসংস্থা আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিন্ধু প্রদেশের শ্রমমন্ত্রী সাঈদ গনি জানিয়েছেন, সিন্ধ এমপ্লয়িজ সোশ্যাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশন (সেসি) পরিচালিত কুলসুম বাই ভালিকা (কেবিভি) হাসপাতাল এবং এর আশপাশের এলাকায় ১০ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২০ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া লান্ধি এলাকায় সেসির আরেকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৃথক পরীক্ষায় আরও ১০ জনের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। সেসি হলো সিন্ধু প্রদেশের একটি স্বয়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যা শিল্প ও বাণিজ্য খাতের শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে থাকে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে করাচির সাইট টাউন এলাকায় কেবিভি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া একাধিক শিশুর এইচআইভি সংক্রমণের ঘটনা প্রকাশ্যে এলে বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে। তবে কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, সংক্রমণের সূত্রপাত আরও আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে হয়েছিল, যখন প্রথম ছয়জন এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর তথ্য সিন্ধুর স্বাস্থ্য বিভাগে আসে। গত ১৪ জুলাই সিন্ধুর মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলী শাহকে দুটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনের ফলাফল জানানো হয়, যেখানে হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় গুরুতর ত্রুটির প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে, সংক্রমণ প্রতিরোধের নির্দেশিকা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি, সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবহার ছিল অপর্যাপ্ত এবং একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ ব্যবস্থাপনায়ও গুরুতর অনিয়ম ছিল।
প্রথম তদন্ত প্রতিবেদনে ১৬ শিশুর আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও, ১৯ জুন জমা দেওয়া দ্বিতীয় তদন্ত প্রতিবেদনে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৮ এবং মৃতের সংখ্যা ছয়জন বলে নিশ্চিত করা হয়। পরবর্তীতে এই সংখ্যা বেড়ে ১৩০ জনে পৌঁছায়। প্রশাসনিক ব্যর্থতার জন্য হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে দায়ী করা হয়েছে এবং ৩৭ জন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। শ্রমমন্ত্রী সাঈদ গনি জানিয়েছেন, দোষী প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও চাকরিচ্যুতির ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি এই ঘটনায় নিজের পরোক্ষ দায় স্বীকার করেছেন এবং প্রয়োজনে পদত্যাগ করতেও আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন।
সংক্রমণের কারণ নিয়ে মতভেদ থাকলেও, সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে সামগ্রিক ব্যর্থতার কথা উঠে এসেছে। এদিকে সিন্ধু হাইকোর্টে করা রিট আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। আদালত প্রাদেশিক সরকারকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে এ বিষয়ে জবাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউএনএইডসের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে পাকিস্তানে বার্ষিক এইচআইভি সংক্রমণ ২০০ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছেন, যার ৮০ শতাংশই জানেন না যে তারা আক্রান্ত।
চলমান এই সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দেশজুড়ে নিম্নমানের সিরিঞ্জ নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। পাকিস্তানের ওষুধ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সাধারণ সিরিঞ্জের খুচরা বিক্রি নিষিদ্ধ করা হবে। এছাড়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোস্তফা কামাল অস্ত্রোপচারের আগে সারা দেশে বাধ্যতামূলক এইচআইভি পরীক্ষা চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। সিন্ধু সরকার আক্রান্ত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য ২০০ কোটি রুপির তহবিল গঠন, বিশেষ আইসোলেশন ওয়ার্ড স্থাপন এবং কেবিভি হাসপাতালের স্বাধীন নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সিরিঞ্জ নিয়ন্ত্রণ করলেই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়; বরং বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের কঠোর তদারকি ও নিরাপদ চিকিৎসাচর্চা নিশ্চিত করা জরুরি।
২০১০ সালে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৪৮ হাজারে পৌঁছেছে।বর্তমানে পাকিস্তানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছেন।
এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই জানেন না যে তারা এই ভাইরাসে আক্রান্ত।বিশ্ব এইডস দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে ডব্লিউএইচও ও ইউএনএইডস জানায়, ২০১০ সালে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে যেখানে ৫৩০টি সংক্রমণ ছিল, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮০০-তে।