July 16, 2026, 9:55 pm

নিটোরকে ঘিরে অর্থোপেডিক ইমপ্ল্যান্টের ভয়াবহ সিন্ডিকেট বাণিজ্য

Reporter Name
  • Update Time : Thursday, July 16, 2026
  • 0 Time View

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) চিকিৎসাধীন অসহায় রোগীদের ঘিরে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর সিন্ডিকেট। হাসপাতালের কতিপয় অসাধু চিকিৎসক, নার্স, ওটি বয় এবং বহিরাগতদের সাথে অর্থোপেডিক ইমপ্ল্যান্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে এই চক্রটি রোগীদের জিম্মি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই চক্রটি নিজেদের সুবিধামতো হিপ, নি ও ট্রমা ইমপ্ল্যান্টের চড়া মূল্য নির্ধারণ করে এবং রোগীদের অন্ধকারে রেখে নিম্নমানের ডিভাইস ব্যবহার করছে। এমনকি বাড়তি আয়ের লোভে ওটিতে ব্যবহৃত পুরনো ইমপ্ল্যান্ট রোগীদের শরীরে পুনরায় ব্যবহারের মতো ভয়াবহ অভিযোগও পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল ইকুইপমেন্ট ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড সাপ্লাইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বাজারে স্টেইনলেস স্টিল ও টাইটানিয়াম—এই দুই ধরনের ইমপ্ল্যান্টের মান ও মূল্যে বড় পার্থক্য থাকলেও অসাধু চিকিৎসকরা প্রকৃত দাম গোপন রাখেন। অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের কোন ব্র্যান্ড বা সাইজের ইমপ্ল্যান্ট লাগানো হলো, তার কোনো দাপ্তরিক ক্যাশ মেমো বা নথি সরবরাহ করা হয় না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইমপ্ল্যান্ট সরবরাহকারী জানান, প্রতিটি বিক্রির বিপরীতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের নির্দিষ্ট কমিশন দিতে হয় এবং হাসপাতাল প্রশাসনের অলিখিত নির্দেশনায় এসব তথ্য গোপন রাখা হয়। তিনি আরও জানান, দেশে সরকার অনুমোদিত বৈধ ইমপ্ল্যান্ট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মাত্র ৮ থেকে ১০টি। বিপরীতে, অনুমোদনহীন ৩০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে ইমপ্ল্যান্ট আনছে, যার বড় অংশই আসছে চীন ও ভারত থেকে লাগেজ পার্টির মাধ্যমে।

অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক মইনুল ইসলাম জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ইমপ্ল্যান্টের মূল্য নির্ধারণে ব্যর্থ হওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন স্বীকার করেছেন যে, হৃদরোগের রিংয়ের মতো ইমপ্ল্যান্টের ক্ষেত্রেও তারা চ্যালেঞ্জের মুখে আছেন এবং দ্রুত যৌথ বৈঠকের মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

হাসপাতালের ভেতরে ইমপ্ল্যান্ট জীবাণুমুক্তকরণ শাখার এক কর্মচারী জানান, রোগীদের শরীর থেকে খুলে ফেলা ইমপ্ল্যান্টের অধিকাংশই তাদের ফেরত দেওয়া হয় না। বিশেষ করে এক্সটার্নাল ফিক্সেশন পদ্ধতিতে ব্যবহৃত পিন, তার ও রডগুলো পুনরায় বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যবহৃত ইমপ্ল্যান্ট রোগীর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর অথবা ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য হিসেবে ধ্বংস করার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

নিটোরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান ইমপ্ল্যান্ট পুনর্ব্যবহারের অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস দিয়ে বলেন, ইমপ্ল্যান্টের তথ্য বুঝে নেওয়া রোগীর স্বজনদের দায়িত্ব। অন্যদিকে, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. লেলিন চৌধুরী সতর্ক করে বলেন, ব্যবহৃত ইমপ্ল্যান্টের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ালে তা অ্যান্টিবায়োটিকেও নিরাময় সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সিন্ডিকেটের মূলোৎপাটনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও দুদকের সমন্বিত অভিযান এখন সময়ের দাবি।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category