July 17, 2026, 10:03 pm

খাদের কিনারা থেকে বারবার ঘুরে দাঁড়ানো আর্জেন্টিনার এক অনন্য মহাকাব্য

Reporter Name
  • Update Time : Friday, July 17, 2026
  • 3 Time View

ফুটবল কেবল ২২ জন খেলোয়াড়ের ৯০ মিনিটের মাঠের লড়াই নয়, আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কাছে এটি এক চিরন্তন আবেগ ও বিশ্বাসের নাম। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের মহাকাব্যিক পথচলা পর্যন্ত আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস যেন ট্র্যাজেডি আর রূপকথার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। বারবার ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার গল্পই হলো আলবিসেলেস্তেদের আসল পরিচয়। শত পরাজয় ও বেদনার বালুচরে দাঁড়িয়েও আকাশি-সাদা জার্সিধারীরা শেষ পর্যন্ত বিজয়ের মরীচিকাকেই সত্যে রূপান্তর করে দেখিয়েছে। কারণ, শেষ বাঁশি বাজার আগে আর্জেন্টিনার ‘শেষ’ লিখে দেওয়া অসম্ভব।

আর্জেন্টিনার এই ফুটবলীয় দর্শনে দুঃখ ও হাহাকারের এক গভীর ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। দীর্ঘ ৩৬ বছরের ট্রফি খরা এবং একের পর এক ফাইনাল হারের বেদনা সমর্থকদের বছরের পর বছর তপ্ত মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু সেই কষ্টের মরুভূমি পেরিয়েই এসেছে বিজয়ের আনন্দ-ধারা। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি ভক্তের সঙ্গে এই দলের সম্পর্ক এক চিরন্তন নাছোড়বান্দা বন্ধনের মতো। প্রতিটি পতনের পর, প্রতিটি হারের কান্নার পরদিন সকালেই সমর্থকেরা আবারও বুক বেঁধেছেন এবং গায়ে জড়িয়েছেন প্রিয় আকাশি-সাদা জার্সি। এই অকৃত্রিম ভালোবাসার কোনো জাগতিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া ভার。

এই দলের ধমনিতে একদিকে যেমন রয়েছে ফুটবলের ঈশ্বর দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার বুনে দেওয়া দ্রোহ, ঔদ্ধত্য আর অসীম সাহসের অগ্নিবীজ; অন্যদিকে লিওনেল মেসি সেই ঐতিহ্যে যোগ করেছেন এক রাজকীয় ও অলৌকিক পূর্ণতা। মেসির ক্যারিয়ার ছিল এক পরম ধৈর্যের পরীক্ষা। একের পর এক ফাইনালের পরাজয়, কোটি মানুষের সমালোচনা এবং ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে এক বুক অভিমান নিয়ে অবসরের ঘোষণা—সব মিলিয়ে তিনি যেন ছিলেন এক ভাগ্য-পীড়িত মহানায়ক। কিন্তু নিয়তি তাকে শূন্যহাতে ফেরায়নি। এক অলৌকিক টানে সবুজ ঘাসের ক্যানভাসে ফিরে এসে জাদুকরি ড্রিবলিং আর চোখের পলকে করা গোলে তিনি আর্জেন্টিনাকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। অবশেষে ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে বিশ্বজয়ের মাধ্যমে তিনি আরোহণ করেছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সিংহাসনে。

আর্জেন্টিনার এই ঐশ্বরিক সাফল্যের মুকুটে আনহেল দি মারিয়া হলেন সেই উজ্জ্বল রত্ন, যিনি দলের চরম সংকটে সবসময় ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। যখনই দল কোনো বড় শিরোপার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে, তখনই দি মারিয়ার জাদুকরি পা থেকে এসেছে মহামূল্যবান গোল। ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিক ফাইনালের সেই অবিশ্বাস্য চিপ গোল, ২০২১ সালে মারাকানার মাঠে ব্রাজিলের বিপক্ষে ঐতিহাসিক গোল এবং ২০২২ সালের লুসাইল স্টেডিয়ামে ফরাসিদের স্তব্ধ করে দেওয়া অনবদ্য গোল প্রমাণ করে যে, দি মারিয়াই ছিলেন আর্জেন্টিনার বহু ঐতিহাসিক বিজয়ের নেপথ্য জাদুকর।

এই রূপকথার মূল কারিগর হলেন শান্ত ও মিতবাক কোচ লিওনেল স্কালোনি। ২০১৮ সালের এক কুয়াশাচ্ছন্ন বিকেলে যখন তিনি অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন চারপাশে ছিল কেবলই সংশয় ও অবজ্ঞার হাওয়া। কিন্তু স্কালোনি নীরবে গড়ে তুললেন এক অপরাজেয় সাম্রাজ্য, যার নাম ‘লা স্কালোনেতা’। তিনি দলের তরুণ খেলোয়াড়দের ভালোবাসার এক অবিচ্ছেদ্য সুতায় বেঁধেছেন, যেখানে প্রত্যেকে তাদের মহানায়ক মেসি এবং দেশের জন্য নিজের শেষ রক্তবিন্দু দিতেও প্রস্তুত। তাঁর অধীনেই ২০২১ সালে মারাকানায় ব্রাজিলের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ে দীর্ঘ ২৮ বছরের ট্রফি খরা কাটে আর্জেন্টিনার। এরপর ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় টানা দ্বিতীয়বারের মতো শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরে তারা। এমনকি ২০২২ সালে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বজয়ের পর ২০২৬ সালের নতুন বৈশ্বিক মহারণেও আর্জেন্টিনা বুক চিতিয়ে লড়াই করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে নিজেদের জায়গা ছিনিয়ে নিয়েছে।

আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসে কয়েকটি দিন চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১৯৮৬ সালের ২২ জুন মেক্সিকোর এস্তাদিও অ্যাজটেকায় ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘ঈশ্বরের হাত’ গোল এবং তার চার মিনিট পর ছয়জন ইংলিশ ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে করা শতাব্দীসেরা একক গোল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। এরপর ২০২১ সালের ১০ জুলাই মারাকানা স্টেডিয়ামে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের বিপক্ষে দি মারিয়ার চিপ গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পেয়ে দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপা খরা দূর করে আর্জেন্টিনা। আর ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর কাতারের লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ৩-৩ সমতা এবং শেষ মুহূর্তের অতিমানবীয় সেভের পর পেনাল্টি শুটআউটে বিশ্বজয় করে তারা।

আর্জেন্টিনা এমন এক দল, যারা খাদের কিনারে দাঁড়ালে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে হেরে যাত্রা শুরু করেও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া কিংবা প্রতিটি নকআউট ম্যাচে স্নায়ুচাপের চরম পরীক্ষা দিয়ে জয় ছিনিয়ে আনা—এটাই আর্জেন্টিনার আসল ডিএনএ। ২০২৬ বিশ্বকাপেও তারা প্রমাণ করেছে যে তাদের স্কোয়াডে কেবল তারকার মেলা নেই, আছে রক্তে মিশে থাকা জেদ। মাঠের সব কোলাহল যখন নিভে যায়, তখনো সবুজ ঘাসের বুকে জেগে থাকে এক অপার্থিব নীল-সাদার মায়া। সমস্ত ক্ষত আর বেদনাকে শান্ত জাদুকরি জ্যোৎস্নায় রূপান্তর করে আর্জেন্টিনা যেন এক অপরাজেয় ডানার পাখি, যা শত ঝড়ের রাতেও শেষমেশ ফিরে আসে বিজয়ের আলো মেখে।

প্রথমার্ধে ২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়া, এরপর প্রতিপক্ষের ঝড়ে সমতা, অতিরিক্ত সময়ে আবার ৩-৩ সমতা, শেষ মুহূর্তের সেই অতিমানবীয় সেভ এবং পরিশেষে পেনাল্টি শুটআউটে বিশ্ব জয়।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category