ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি এবং খুনের ঘটনা সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থাকেই তুলে ধরছে। গত সোমবার চট্টগ্রাম মহানগরে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসীদের ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এর আগে জুন মাসে ঢাকার মোহাম্মদপুরে একই ধরনের হামলার শিকার হন ব্যবসায়ীরা। নরসিংদীতে এক ব্যবসায়ীকে কান কামড়ে আহত করে এলাকা ছাড়ার হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব হামলা ও অনিশ্চয়তা কেবল ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতাই তৈরি করছে না, বরং তা দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পুলিশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম সংকটে পড়েছিল। সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন ও জনআস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব স্পষ্ট। অথচ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছিল। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক তথ্য পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা প্রমাণ করে। টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের ১০০ দিনে ৬০৫টি খুন, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬টি অপহরণ এবং ৩ হাজার ৪৯৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া এইচআরএসএসের তথ্যানুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫৬ জন নিহত হয়েছেন, যার ৮১ শতাংশই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা দলীয় সংঘর্ষের জেরে ঘটেছে।
চট্টগ্রামের ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানিয়েছে, এর সঙ্গে বিদেশে পলাতক এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনুসারীরা জড়িত। বিগত দুই বছর ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে চাঁদাবাজি ও অপহরণের মতো অপরাধে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া দেওয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর বিএনপির নেতা-কর্মীদের একাংশের বিরুদ্ধে দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে এবং নির্বাচনের পর অনেকের মধ্যে ‘এবার আমাদের পালা’—এমন মনোভাব অপরাধ পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। গণমাধ্যমের তথ্যমতে, তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি কোথাও কোথাও স্থানীয় সংসদ সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। দলীয় লোকজনকে নিবৃত্ত করার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে গত পাঁচ মাসে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেওয়া পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে আজ বড় প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।