মানব সমাজের প্রাণ হলো সন্তান-সন্ততি। সংসার জীবনে সন্তানের উপস্থিতি ছাড়া জীবন অনেকটা মরুভূমির মতো প্রাণহীন মনে হয়। তবে বর্তমান সময়ে অভিভাবক হিসেবে আমরা সন্তানের কাছে যা আশা করছি, তা কতটা যৌক্তিক—সেটি ভেবে দেখার সময় এসেছে। আমরা কি সন্তানকে ত্যাগ, জবাবদিহি এবং মূল্যবোধের শিক্ষায় বড় করছি, নাকি তাদের একটি ভোগবাদী ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছি? আমাদের সন্তানরাই আমাদের ভবিষ্যৎ, তাই তাদের বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে অভিভাবকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর জন্ম থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে বাবা-মাকে সজাগ থাকতে হয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘সর্বোত্তম ব্যয় হলো সেই ব্যয়, যা একজন ব্যক্তি তার পরিবারের জন্য করে’ (মুসলিম : ৯৯৪)। কিন্তু এই ব্যয় করতে গিয়ে আমরা কি ভুল করছি? শিশুকে অতিরিক্ত মনোযোগ, আহ্লাদ এবং কেবল উৎপাদনশীল প্রাণী তৈরির প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত রেখে তাকে কি আমরা অবাস্তব ও অমানবিক করে তুলছি না? ভালো স্কুল, দামি খাবার কিংবা একাধিক গৃহশিক্ষকের চাপে আমরা তাদের স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগটুকু কেড়ে নিচ্ছি কি না, তা আমাদের ভেবে দেখা প্রয়োজন।
কোরআনের সুরা কাহফের ৪৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য এবং সুখ-শান্তির বাহন ও উপাদান।’ একই সঙ্গে সুরা আনফালের ২৮ নম্বর আয়াতে সন্তানকে ‘মহাপরীক্ষা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। দার্শনিক সক্রেটিসের মতে, সম্পদের আধিক্য নয়, সদগুণই প্রকৃত সুখের উৎস। অথচ বর্তমানে ধর্মীয় অনুশাসন, মানবিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চায় অভিভাবক সমাজের উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে সন্তান বাবা-মাকে অবজ্ঞা করছে, এমনকি চরম অবক্ষয়ের শিকার হয়ে খুনের ঘটনাও ঘটছে।
সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, লিঙ্গভেদে বিভাজন না করে তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই প্রধান ব্রত হওয়া উচিত। শুধু বিদেশি ডিগ্রি বা ভালো পেশার পেছনে না ছুটে তাদের প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও অসুস্থ মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ শেখাতে হবে। তাদের বুঝতে হবে যে, জীবন কেবল ভোগবিলাসের নাম নয়। বর্তমান সময়ের ভার্চুয়াল নেশা ও খেলার মাঠের সংকটের এই যুগে শিশুদের সামাজিকীকরণে বাবা-মাকে বন্ধুর ভূমিকা পালন করতে হবে।
রুশোর মতে, ‘শিশুকে বস্তু নয়, মানুষ হিসেবে গড়ে তোলো।’ এই দর্শনের আলোকে আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝে ভারসাম্য আনতে হবে। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষা বা ক্যারিয়ারের চেয়ে সন্তানের মেধা ও আগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। আগামীর সন্তান যেন ভোগের পাত্র না হয়ে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে, এটাই আজকের বড় প্রত্যাশা।