সুন্দরবনে বসবাসরত বাঘের শরীরে চার ধরনের পরজীবীর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে। শুধু বাঘ নয়, বাঘের প্রধান শিকার হরিণ, বন্য শূকর ও বানরের শরীরেও এই পরজীবীর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষকদের আশঙ্কা, এই পরজীবীগুলো বাঘের শারীরিক সক্ষমতা কমিয়ে শিকার ধরার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাঘের স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পাঁচজন গবেষক যৌথভাবে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সুন্দরবনের ৬৫টি স্থান থেকে বাঘ ও অন্যান্য প্রাণীর মল ও রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। মোট ৩৯৯টি প্রাণীর নমুনা পরীক্ষা করে এই ফলাফল পাওয়া গেছে। গবেষণায় বাঘের শরীরে গোলকৃমি, ফিতাকৃমি, পাতাকৃমি ও এককোষী পরজীবীর সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ফিতাকৃমি এবং ৫৩ শতাংশ ক্ষেত্রে গোলকৃমির সংক্রমণ পাওয়া গেছে।
গবেষণা দলের নেতৃত্বদানকারী সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগের অধ্যাপক সুলতান আহমেদ জানান, এই পরজীবীগুলোকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। এগুলো সরাসরি মৃত্যু না ঘটালেও বাঘের পরিপাকতন্ত্র থেকে পুষ্টি শোষণ করে তাকে অপুষ্টি ও শারীরিক দুর্বলতার দিকে ঠেলে দেয়। দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণে বাঘের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়, যা প্রজননক্ষমতা ও শাবকের বেঁচে থাকার হারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে টক্সোকেরা ক্যাটি নামের পরজীবী বাঘের শাবকের জন্য মারাত্মক হতে পারে।
গবেষকদের তথ্যমতে, বাঘের শিকারি প্রাণীদের মধ্যেও সংক্রমণের হার বেশ উদ্বেগজনক। হরিণের মধ্যে ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ গোলকৃমি, বানরের মধ্যে ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ গোলকৃমি ও এককোষী পরজীবী এবং বন্য শূকরের মধ্যে ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ গোলকৃমি ও ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ এককোষী পরজীবীর সংক্রমণ পাওয়া গেছে। পরজীবীগুলো মূলত শামুক বা ঘাসের মাধ্যমে প্রথমে তৃণভোজী প্রাণীদের শরীরে ঢোকে এবং পরে তা বাঘের অন্ত্রে পৌঁছায়।
বাঘের জন্য ক্যানাইন ডিস্টেম্পার ভাইরাসকে সবচেয়ে মারাত্মক সংক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন গবেষকরা। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় কুকুরের রক্তে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে বাঘের কুকুরের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা কম থাকলেও, ঝুঁকি এড়াতে সুন্দরবনের এক কিলোমিটার এলাকা থেকে কুকুর সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বাঘ বিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ বলেন, গবেষণায় পাওয়া তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে বাঘের ওপর এই হুমকি কমানোর কৌশল নির্ধারণ করা এখন জরুরি।