মাতারবাড়ীতে অবস্থিত একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের জেরে সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। মঙ্গলবার টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দৈনিক ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এরপর এলএনজিবাহী জাহাজ সংকটের কারণে শনিবার থেকে আরও ৭ কোটি ঘনফুট সরবরাহ কমানো হয়েছে। এই গ্যাস সংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাবে দেশের প্রায় ২৫০০ শিল্পকারখানা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তিতাস গ্যাসসহ বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানির আওতাধীন এলাকাগুলোতে উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অনেক কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে, আবার কেউ কেউ উচ্চমূল্যে ডিজেল কিনে আংশিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
তিতাসের হিসাব অনুযায়ী, তাদের আওতাধীন ৪ হাজার ৫০০ শিল্প গ্রাহকের মধ্যে নরসিংদী, সাভার-আশুলিয়া, কোনাবাড়ী, গাজীপুর ও জামালপুরসহ বিভিন্ন এলাকার দুই থেকে আড়াই হাজার কারখানা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। আশুলিয়ার মতো শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ ৭০ পিএসআই থাকার কথা থাকলেও তা নেমে এসেছে ৩০ পিএসআইতে। ধনুয়া এলাকায় ৩০০ পিএসআইয়ের স্থলে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৬০ পিএসআই। আমিনবাজার দিয়ে দৈনিক ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের কথা থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৪০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছে। রাজেন্দ্রপুর এলাকার ইশরাক স্পিনিংয়ের মতো অনেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা কর্মহীন বসে আছেন।
টার্মিনাল অপারেটর মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটর জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার সকালে টার্মিনালের বয়েলারে আগুন লেগে কন্ট্রোল সিস্টেমের যন্ত্রপাতি ও কেবল পুড়ে যায়। বর্তমানে যুক্তরাজ্য থেকে আসা তিন বিশেষজ্ঞ মেরামতের কাজ করছেন। কিছু বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ ইউরোপ থেকে আনার চেষ্টা চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ১ বা ২ আগস্ট থেকে আংশিক এবং ১০ আগস্ট থেকে পূর্ণাঙ্গ গ্যাস উৎপাদন শুরুর আশা করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলা এক্সিলারেটর টার্মিনাল বন্ধের আগে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ করত ২৬৫ কোটি ঘনফুট, সেখানে এখন করা হচ্ছে ২১৩ কোটি ঘনফুট। নিরাপত্তার কারণে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের পরিদর্শনের পরিকল্পনা বাতিল করা হলেও, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য চট্টগ্রাম গিয়েছেন।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ খাতেও। স্বাভাবিক সময়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৭৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হলেও এখন তা কমিয়ে ৬৮ কোটি ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর ফলে সারা দেশে লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রোববার বিকাল ৪টা পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ৬ হাজার মেগাওয়াট থেকে কমে ৩ হাজার ৮৮৫ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। বর্তমানে সারা দেশে দৈনিক মোট ২১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জ্বালানি বিভাগকে দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করার নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম কাস্টমস বিভাগের বাধার মুখে থাকা একটি এলএনজিবাহী জাহাজ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতাও নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।