করোনার পর থেকে দেশে চিনির ব্যবহার প্রায় ৩৩ শতাংশ কমেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাস্থ্যসচেতনতা, চিনির উচ্চ দাম এবং চিনিমুক্ত পণ্যের প্রসারই এই পরিবর্তনের মূল কারণ। ঢাকার পান্থপথের বাসিন্দা আল আমিন বয়স চল্লিশের নিচে হলেও ডায়াবেটিসের ভয় ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়ে চিনি এড়িয়ে চলেন। চট্টগ্রামের মনসুর আলমের ক্ষেত্রে বিষয়টি পছন্দের চেয়ে প্রয়োজনের; চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি চায়ে চিনি ছেড়ে দিয়েছেন এবং বাজার থেকে কোনো খাদ্যপণ্য কেনার আগে খুঁটিয়ে দেখেন সেটি চিনিমুক্ত কি না। শুধু আল আমিন বা মনসুর আলম নন, দেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্র খাদ্যাভ্যাসে এই নীরব পরিবর্তন ঘটছে।
এই পরিবর্তনের প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানেও। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্য বলছে, ২০২১–২২ থেকে ২০২৫–২৬ এই পাঁচ বিপণন মৌসুমে (মে–এপ্রিল সময়কাল) বাংলাদেশে চিনির ব্যবহার প্রায় ৩৩ শতাংশ কমেছে। প্রধান ভোক্তা দেশগুলোর মধ্যে এই সময়ে ব্যবহার কমার হার বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। সংস্থাটি খাদ্য ও পানীয় শিল্পে ব্যবহারসহ মানুষের ভোগের জন্য ব্যবহৃত চিনির হিসাব করেছে। বাংলাদেশের পর চিনির ব্যবহার বেশি কমেছে ভিয়েতনামে, প্রায় ১১ শতাংশ। একই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ, ব্রাজিলে ৫ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ৪ শতাংশ ব্যবহার কমেছে।
বাংলাদেশের এই প্রবণতা বৈশ্বিক চিত্রের বিপরীত। ২০২১–২২ মৌসুমে বিশ্বে মানবভোগে চিনির ব্যবহার ছিল প্রায় ১৭ কোটি ৪০ লাখ টন। ২০২৫–২৬ মৌসুমের নভেম্বরের প্রাক্কলনে তা বেড়ে প্রায় ১৭ কোটি ৮১ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে ব্যবহার প্রায় ৩৩ শতাংশ কমলেও বিশ্বে বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ইউএসডিএর তথ্যে দেখা যায়, করোনাকাল পর্যন্ত বাংলাদেশে চিনির ব্যবহার বাড়ছিল। মহামারির পর থেকেই প্রবণতা বদলাতে শুরু করে। ২০২১–২২ মৌসুমের ২৭ লাখ ৬৭ হাজার টন থেকে পরের মৌসুমে তা ২২ লাখ ৩৭ হাজার টনে নামে। ২০২৩–২৪ মৌসুমে ব্যবহার ছিল ২০ লাখ ৪৫ হাজার টন এবং ২০২৪–২৫ মৌসুমে ১৮ লাখ ৯০ হাজার টন। ২০২৫–২৬ মৌসুমে তা আরও কমে ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টনে নামার প্রাক্কলন করেছে ইউএসডিএ।
বাংলাদেশে ব্যবহৃত প্রায় সব চিনি আমদানিনির্ভর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১–২২ অর্থবছরে দেশে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ ২৫ হাজার টন চিনি আমদানি হয়েছিল। বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে আমদানি কমে হয়েছে ২১ লাখ টন। এর মধ্যে ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টন অপরিশোধিত এবং ২ লাখ ৩৭ হাজার টন পরিশোধিত চিনি। এনবিআরের আমদানি তথ্য ও ইউএসডিএর ব্যবহার-সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে, যার কারণ বন্ড সুবিধায় আমদানি, অর্থবছর ও বিপণন মৌসুমের পার্থক্য, মজুত এবং অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়–ব্যয় জরিপের ২০১০ ও ২০১৬ সালের প্রকাশনা অনুযায়ী, ২০১০ সালে একজন মানুষ দিনে গড়ে ৭ দশমিক ৪০ গ্রাম চিনি খেতেন, যা ২০১৬ সালে কমে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৪০ গ্রামে। ২০২২ সালের জরিপে চিনি, গুড় ও মিষ্টি একত্রে একটি খাদ্যগোষ্ঠী হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার সম্মিলিত জনপ্রতি দৈনিক গ্রহণের পরিমাণ ১৬ দশমিক ৪০ গ্রাম। তবে ইউএসডিএর প্রতিবেদনে প্রকাশিত বাংলাদেশের মৌসুমভিত্তিক মোট চিনি ভোগের তথ্যকে বিশ্বব্যাংকের বছরভিত্তিক জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে দেখা যায়, ২০২১–২২ মৌসুমে মাথাপিছু চিনি ব্যবহার ছিল বছরে ১৬ দশমিক ৫১ কেজি (দিনে ৪৫ দশমিক ২২ গ্রাম)। পরের মৌসুমে তা নেমে আসে ১৩ দশমিক ২১ কেজি (৩৬ দশমিক ১৮ গ্রাম)। এরপর ২০২৩–২৪ মৌসুমে ছিল ১১ দশমিক ৯৩ কেজি (৩২ দশমিক ৬৮ গ্রাম), ২০২৪–২৫ মৌসুমে ১০ দশমিক ৮৯ কেজি (২৯ দশমিক ৮৩ গ্রাম) এবং ২০২৫–২৬ মৌসুমে ১০ দশমিক ৭৭ কেজি (২৯ দশমিক ৫০ গ্রাম)। এতে খাদ্যশিল্প, হোটেল–রেস্তোরাঁ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চিনির বিকল্প মিষ্টিকারক সুক্রালোজের আমদানি দ্রুত বাড়ছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১–২২ অর্থবছরে দেশে ২২ হাজার ৬৬১ কেজি সুক্রালোজ আমদানি হয়েছিল, যা ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ১৮১ কেজিতে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে সুক্রালোজ আমদানি বেড়েছে প্রায় ৩৭৭ শতাংশ বা ৪ দশমিক ৮ গুণ। চিনিমুক্ত বা কম চিনিযুক্ত বিস্কুট, পানীয়, দুগ্ধজাত পণ্য ও ওষুধে এটি ব্যবহৃত হয়।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, ডায়াবেটিসের বিস্তার, স্বাস্থ্যসচেতনতা, চিনির উচ্চ দাম এবং চিনিমুক্ত পণ্যের প্রসারই চিনির ব্যবহার কমার প্রধান কারণ। ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের ডায়াবেটিস অ্যাটলাসের ২০২৫ সালের সংস্করণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা ১ কোটি ৩৮ লাখ। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭১ লাখ। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্বে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যায় দশম অবস্থানে থাকলেও ২০২৪ সালে দেশটি সপ্তম অবস্থানে উঠে এসেছে। টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান শাহ মঈনুদ্দিন হাসান বলেন, মানুষ এখন দুধ–চায়ের চেয়ে রং–চা বেশি পান করছেন এবং চিনি ছাড়া চা পান করছেন, যা চিনির ব্যবহার কমাচ্ছে।
চিনির দামের প্রভাবও ভোগে পড়েছে। ২০২২ সালের অক্টোবরে খুচরা বাজারে চিনির দাম প্রথমবারের মতো কেজিপ্রতি ১০০ টাকা ছাড়ায় এবং একপর্যায়ে ১৫০ টাকায় ওঠে। ট্রেডিং করপোরেশনের হিসাবে, এখন খুচরায় কেজিপ্রতি ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় চিনি বিক্রি হচ্ছে। প্রাণ–আরএফএলের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানান, স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের চাহিদার কারণে তারা চিনিমুক্ত বা কম চিনিযুক্ত খাদ্যপণ্যের সরবরাহ বাড়িয়েছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, নিয়মিত অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ ওজন বৃদ্ধি ও বিপাকীয় রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, তাই চিকিৎসকেরা চিনি সীমিত করতে বলেন। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের সহকারী অধ্যাপক তুহিন বিশ্বাস জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সচেতনতা বাড়ায় মানুষ নিজেরাই চিনি কমাচ্ছেন। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানান, বর্তমান চাহিদা বিদ্যমান কারখানাগুলো দিয়েই পূরণ করা সম্ভব, তাই নতুন বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়নি। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, দ্রুত প্রবৃদ্ধির পুরোনো ধারা যে বদলাচ্ছে, তা পরিসংখ্যানে স্পষ্ট।
পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ হাজার ১০২ কেজিতে।
২০২৩–২৪ অর্থবছরে আমদানি আরও বেড়ে ৮০ হাজার ৬৮৮ কেজিতে পৌঁছায়।