ফুটবলে একই মানুষকে কখনও ভাই, আবার কখনও প্রতিপক্ষ হিসেবে লড়তে হয়। ক্লাব ফুটবলে যে খেলোয়াড়দের সকাল শুরু হয় একই ড্রেসিংরুম, জিম কিংবা অনুশীলনের মাঠে, বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যায় ভিন্ন দুটি দেশের পতাকা। সেই মুহূর্তে বন্ধুত্ব নয়, বরং দেশের পরিচয়ই বড় হয়ে ওঠে। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল ম্যাচটি ছিল এমন কয়েকটি বন্ধুত্বের বড় পরীক্ষা।
অ্যাস্টন ভিলায় এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ও মরগান রজার্স একই ড্রেসিংরুমে সময় কাটান। অনুশীলনের সময় রজার্সের শট ঠেকানো এমিলিয়ানোর রুটিন কাজ, আবার গোল হলে দুজনে মিলে উদযাপনও করেন। ম্যাচ শেষে তারা একই বিমানে ফেরেন। তবে আটলান্টার সেই রাতে হিসাবটা ছিল ভিন্ন। রজার্স ইংল্যান্ডের হয়ে আক্রমণ সাজাতে ব্যস্ত ছিলেন, আর এমিলিয়ানো ছিলেন আর্জেন্টিনার শেষ প্রহরী। একজনের সাফল্য মানেই তখন অন্যজনের ব্যর্থতা।
টটেনহ্যামের ক্রিস্তিয়ান রোমেরো ও জেড স্পেন্সের সম্পর্কের চিত্রটাও একই। ক্লাবে তারা একই জার্সির জন্য লড়াই করেন এবং একজনের ভুল অন্যজন ঢেকে দেন। কিন্তু বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে রোমেরোর প্রতিটি ট্যাকলের লক্ষ্যই ছিল স্পেন্সকে থামিয়ে দেওয়া। মুহূর্তের মধ্যেই পরিচিত সেই মুখটি সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও কোবি মাইনু বছরের বেশির ভাগ সময় একই ড্রেসিংরুমে কাটান এবং ক্লাবের জয়ে আনন্দ ভাগ করে নেন। অথচ বিশ্বকাপের রাতে একজন আর্জেন্টিনার স্বপ্ন বাঁচাতে মরিয়া ছিলেন, অন্যজন লড়ছিলেন ইংল্যান্ডকে ১৯৬৬ সালের পর ফাইনালে তোলার জন্য। ক্লাব ফুটবল বন্ধু তৈরি করে, কিন্তু বিশ্বকাপ সেই বন্ধুদেরই প্রতিপক্ষ বানিয়ে দেয়। যে ড্রেসিংরুমে তারা একসঙ্গে হাসাহাসি করেছেন, সেই স্মৃতি ৯০ মিনিটের জন্য মুছে ফেলতে হয়।
আটলান্টায় ট্যাকলের আগে খেলোয়াড়রা একবারের জন্যও ভাবেননি যে সামনে থাকা মানুষটি তাদের ক্লাবের সতীর্থ। বিশ্বকাপে আবেগের কোনো স্থান নেই, নেই ভুল করার সুযোগও। একটি ভুল পাস, সিদ্ধান্ত কিংবা এক সেকেন্ডের দ্বিধা চার বছরের দীর্ঘ অপেক্ষাকে শেষ করে দিতে পারে।
অবশ্য ম্যাচ শেষে ছবিটা আবার বদলে যায়। কেউ জেতে, কেউ হারে। কয়েক সপ্তাহ পর সবাই আবার নিজেদের ক্লাবে ফিরে একই ড্রেসিংরুমে বসবেন। হয়তো কেউ হাসতে হাসতে বলবেন, ‘সেদিন তোমাকে ছাড়িনি’, অন্যজন হয়তো বলবেন, ‘পরেরবার আমিই জিতব।’ ফুটবল আবার তাদের এক করে দেবে। তবে বিশ্বকাপের ৯০ মিনিট কখনো ভুলে যাওয়ার নয়, কারণ সেখানে বন্ধুত্বের চেয়ে দেশের নামই বড় হয়ে দাঁড়ায়। ক্লাবের হয়ে জেতা ট্রফি গর্বের হলেও, দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জেতা একজন ফুটবলারের জীবনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা।