গত ১২ জুলাই সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের অদূরে শ্যালা নদীর তীরে একটি বাঘিনীকে অবমুক্ত করা হয়। চোরা শিকারিদের ফাঁদে আটকে আহত হওয়ার পর সুস্থ করে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার এটিই ছিল বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে প্রথম ঘটনা। তবে অবমুক্তের সময়কার পরিবেশ ও প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে অভিযোগ করেছেন যে, এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। প্রাণীটির বনে ফেরার ছবি ও ভিডিও ধারণ করার সুবিধার্থে অনেকের কথামতো বাঘিনীকে প্রথমে তীর থেকে প্রায় ২০০ মিটার আগে মাঝনদীতে ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বাঘিনীটিকে ছাড়া হচ্ছে সুন্দরবনে, বসছে ২০টি ট্র্যাপ ক্যামেরা, টিকতে পারবে কি—এমন সংশয়ও তৈরি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বাঘিনীটি নিজের শক্তিতে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না এবং হাঁটার সময় বারবার ডানে-বাঁয়ে কাত হয়ে পড়ছে। বেলা একটার দিকে যখন তাকে অবমুক্ত করা হয়, তখন সেখানে অনেক মানুষের হইচই, ইঞ্জিনের শব্দ এবং তিন থেকে চারটি ড্রোনের উড্ডয়ন ছিল। বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মতে, এমন কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে একটি বন্যপ্রাণীকে অবমুক্ত করা মোটেও সমীচীন ছিল না। ভ্যাপসা গরমে খাঁচার মধ্যে প্রায় ১০ ঘণ্টা অবস্থান করছিল বাঘিনীটি।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বাঘিনীটি শুরুতে দুর্বল থাকলেও পরে বনে তার হাঁটার ছাপ পাওয়া গেছে। তিনি স্বীকার করেন যে, বাঘিনীকে আরও কিছুক্ষণ পর অবমুক্ত করলে হয়তো ভালো হতো। বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এর আগে বাঘিনীটিকে বহনকারী লঞ্চের চারপাশে সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফারদের উপস্থিতিতে ব্যাপক কোলাহল সৃষ্টি হয়েছিল। ওয়াইল্ড টিমের প্রধান নির্বাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম জানান, ১১ জুলাই দিবাগত রাত তিনটার দিকে খুলনার ওয়াল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারে বাঘিনীটিকে ট্রাঙ্কুলাইজার দিয়ে অচেতন করা হয়েছিল, যা তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বাঘ অবমুক্ত করার সময় নীরব ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা আবশ্যক। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান বলেন, আন্তর্জাতিক প্রটোকল হলো প্রথমে ‘সফট রিলিজ’ পদ্ধতি অনুসরণ করা। ২০০৮ সালে রাশিয়ায় ও ২০২৪ সালে ভারতে দুটি বাঘ অবমুক্ত করা হয়েছিল, যেখানে এই প্রটোকল কঠোরভাবে মানা হয়েছিল, কিন্তু এখানে তার ব্যত্যয় ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, গত ৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকির খালসংলগ্ন এলাকা থেকে বাঘিনীটিকে অচেতন করে উদ্ধার করা হয়েছিল। এরপর কয়েক মাসের চিকিৎসা ও পরিচর্যায় তাকে সুস্থ করে তোলা হয়। বর্তমানে বাঘিনীটির বিচরণ এলাকায় ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে নজরদারি করা হচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এ আজিজ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরার ফুটেজ দেখে বাঘিনীটির স্বাভাবিক হয়ে ওঠার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।